ফ্রি ফেসবুক
আজমল সাহেবের মন মেজাজ খুবই তিরিক্ষি। বাসায় এতোক্ষণ ভালো লাগে! করোনা আসার পর মিটিং গুলোও হয় ভিডিও কলে। অথচ তিনি ভেবেছিলেন মন্ত্রী হবার পর সাই সাই করে ওয়ার্ল্ড ট্যুর করবেন। প্রত্যন্ত অঞ্চল প্রদর্শনের নামে ট্যুর ও হয়ে যাবে। আর কই গেলো সেই প্লান। এদিকে অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট ফুটেজ খেতে পারলেও টেলিযোগাযোগ ডিপার্টমেন্টটা কেমন যেন নিস্প্রভ।
স্বাস্থ্য ডিপার্টমেন্ট কিছু না জেনেই ভাইরাল হয়ে যায়। সড়ক ডিপার্টমেন্ট করোনার চেয়ে শক্তিশালী দাবী করে ভাইরাল হয়ে যায়। নদী ডিপার্টমেন্ট তেরো ঘন্টা পর মানুষ উদ্ধার করে ভাইরাল হয়ে যায়। এমন কি বাংলা একাডেমি পর্যন্ত গরু-কে গোরু বানিয়ে আলোচনায় চলে আসে। আর ইন্টারনেট যেই ডিপার্টমেন্ট এর আন্ডারে চলে সেই টেলিযোগাযোগ ডিপার্টমেন্ট ই রয়ে যায় অন্তরালে। এটা কোনো কথা।
.
আজকাল পোস্ট দিয়ে কিছুটা ভাইরাল হবার চেষ্টা করেন আজমল সাহেব। কিন্তু এতে ক্রিয়েটিভিটি প্রচুর খরচ হয়। সবসময় কি এতো বুদ্ধি খরচ করতে ইচ্ছে হয়!
নাহ! এভাবে হয় না।
আজমল সাহেব ফোন করলেন তার পিএস পিয়াস কে।
.
পিয়াস তার বাচ্চার সাথে তখন ঘোড়া ঘোড়া খেলছিলো। ফোন স্ক্রিনে আজমল সাহেবের নাম ভেসে আছে দেখেই তিনি চোখ বন্ধ করে মনে মনে তিনটি গালি দিলেন। এবার চোখ খুলে কল রিসিভ করলেন।
:হ্যালো আসসালামু আলাইকুম স্যার। ভালো আছেন?
:হ্যাঁ পিয়াস। করো কি সারাদিন! শোনো সবাইকে ডাকো। বলো আমি মিটিং ডেকেছি।
:কিন্তু স্যার মিটিং তো জুম এপে হবে।
:অহ। হ্যাঁ। আচ্ছা তাহলে সবাইকে বলো বিকাল ৩ টায় মিটিং।
:জ্বী আচ্ছা স্যার।
.
বিকাল ৩:৩০
আজমল সাহেব তার মেয়ে অবনীর বানানো ডালগোনা কফিত খাচ্ছেন। চুমুক দিয়েই মুখটা তিতিয়ে গেছে। চিনি কম। কিন্তু হাসি হাসি মুখ করে বললেন,"দারুণ হয়েছে আম্মাজান।"
অবনী মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো," আমি ইচ্ছা করেই চিনি দিই নি। তোমার ডায়বেটিস তাই।"
ডায়বেটিস রোগটা আজমল সাহেবের একদম ভালো লাগে না। তিনি চান ব্যপারটা ভুলে থাকতে। এই এক রোগ তার জীবনের সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। তার বিরক্তি ধরে গেলো। সে মেয়েকে বললো, "আম্মাজান, কফিটা রেখে যান। আমি খেয়ে নেবো।"
:না তুমি এখন খাবা। নিজের রান্না করা খাবার খাওয়া দেখায় আনন্দ আছে৷
আজমল সাহেব বিষের মতো করে পুরোটা কফি শেষ করে মুখে হাসি এনে বললেন,"নেও আম্নাজান। শেষ।"
:থ্যাঙ্কিউ।
বলে অবনী গ্লাসটা নিয়ে বেড়িয়ে গেলো।
এদিকে আজমল সাহেবের পেট গলা এখনো তিঁতায় গুলাচ্ছে৷
এমন সময় কল করলো পিয়াস।
রিসিভ করেই দারাজ গলায় আজমল সাহেব বললেন,"কি জন্য ফোন করতে হইলো তোমার?"
:স্যার আজ তিনটায় মিটিং ডেকেছিলেন।
:তো আসছে সবাই?
:স্যার মিটিং তো জুম এপে হবে। আপনি হোস্ট করবেন। আমি সবার ইমেইলে আপনার জুমের লিংক দিয়ে দিয়েছি।
:অহ। আসতেছি আমি।
আজমল সাহেব ল্যাপটপটা নিয়ে মিটিং হোস্ট করলেন।
.
টেলিযোগাযোগ ডিপার্টমেন্টের মিটিং এ এড হলেন উপমন্ত্রী সবিলা ইয়াসমিন , সচিব নেয়ামত, উপসচিব মোহাম্মদ নাসিম, হারুন খালিদ এবং নেহাল।
.
আজমল সাহেব শুরু করলেন,"আপনারা নিশ্চই অবগত আছেন গত কয়েক মাস ধরে আমাদের ডিপার্টমেন্ট একদম ই আলোচনায় নেই। কিন্তু এভাবে চলতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। ডিপার্টমেন্ট যদি আলোচনায় রাখতে না পারি তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে মান সম্মান থাকবে না।
এক্ষেত্রে কি করা যায় বলেন।
উপমন্ত্রী সাবিলা বললেন,"স্যার আমাদের দেশে যৌন হয়রানি অনেকাংশে বেড়ে গেছে। করোনার মতো মুমূর্ষু সময়েও বাচ্চা যৌন হয়রানির স্বীকার হচ্ছে। এর মূল কারণ হলো পর্ণ। মানুষ যা দেখে তা ই রিয়েল লাইফে এপ্লাই করতে চায়। এক্ষেত্রে তারা বাচ্চাদের পর্যন্ত ছাড় দেয় না। আমরা পর্ণ বন্ধ করে দিতে পারি।"
.
আজমল সাহেব বিরক্ত হয়ে গেলেন,"ধুর মহিলা মানুষের সব মহিলা মহিলা কথাবার্তা। ইউএসএ, কানাডার মতো দেশে পর্যন্ত পর্ণ বন্ধ করে নাই। সৌদি আরব, দুবাই তেও পর্ণ চলে। উন্নত দেশে পর্যন্ত পর্ণ বন্ধ করে নাই। যত্তসব।
.
সচিব নেয়ামত বললেন,"স্যার বর্তমানে আমাদের অনেক করোনা রোগীই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। আমরা তো চাইলে একটা এপ লঞ্চ করতে পারি। এখানে সব সুস্থ করোনা আক্রান্তদের ডাটা থাকবে। তাহলে প্লাজোমা খোঁজার জন্য আমাদের আর হন্যে হয়ে খুঁজতে হবে না।
.
আজমল সাহেবের মনে হলো এর মতো বেওকুফ লোক ই কেন তার ডিপার্টমেন্টে আসতে গেলো! এপ। রিসিয়াসলি!
তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন,'এপ লঞ্চ কি বললেই হয়ে গেলো! তাছাড়া কত্ত রোগী পালায় গেছে। ডাক্তাররা কত্ত ভুয়া সার্টিফিকেট দিছে আপনি কিভাবে জানবেন! ডাটা এত্ত সহজ!"
.
নেহাল বললো,"স্যার আমরা টিকটক বন্ধ করে দিতে পারি। ইন্ডিয়াতেও টিকটক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এর মাধ্যমে অশ্লীলতা অনেক বেড়ে গেছে।"
.
আজমল সাহেব যেন হুংকার করে উঠলেন। তার আদরের একমাত্র মেয়ে টিকটক করে সময় কাটায়। টিকটক হচ্ছে মানুষকে বাসার ভিতরে রাখার একটি উপযুক্ত মাধ্যম সেখানে এ সময় এর মতো এত্ত প্রয়োজনীয় একটা এপ বন্ধ করে দেওয়ার কথা মানুষ ভাবে কিভাবে! আজমল সাহেব বললেন,"চীন আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। আপনি তাদের এপ বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব করেন কিভাবে!"
নেহাল মাথা নিচু করে ফেললো।
.
উপসচিব হারুন বললো,"স্যার আমরা হিন্দী সিরিয়াল চ্যানেল গুলো বন্ধ করে দিতে পারি। কারণ.....
আজমল সাহেব হারুণের কথা থামিয়ে বললেন,"ব্যাস ব্যাস! আর বলতে হবে না।/ আপনার বুদ্ধি আপনার মাথা পর্যন্তই রাখেন।"
.
এমন সময় মিটিং এ এড হলেন আরেক উপসচিব সাদিয়া সিদ্দিক। এড হয়েই বললেন," সরি ফর বিং লেট। মিটিং কি শেষ হয়ে গেছে?"
.
আজমল সাহেব যেন মনে মনে তাকেই খুঁজছিলেন। এত্তক্ষণে মনে হলো মিটিং এর ষোলকলা পূর্ণ হলো।
তিনি বললেন, "না। মিটিং এখনো আপনার অপেক্ষায় বসে আছে। তা কই থাকেন আজকাল? অনলাইনে পাওয়া যায় না।
:আসলে স্যার। নতুন বয়ফ্রেন্ড হয়েছে তো। তাই অফ লাইনে থাকি। চ্যাট ওপেন করলেই সবাই টেক্সট দেয়, রিপ্লাই কেন করি না!
:কিন্তু আমি তো অফলাইনে থাকলেও আমাকে নাকি অনলাইন দেখায়।
:স্যার সেটা ম্যাসেঞ্জারে কিংবা ফেসবুকে। ফ্রি ফেসবুকে দেখায় না।
.
আজমল সাহেবের মন কেমন খটমট করতে লাগলো। এজন্যই মিস সাদিয়াকে আজকাল অনলাইনে দেখা যায় না। অনলাইনে থাকলে," আমার রিপ্লাই দেও না কেন ও বলা যায় না। ইস কি যন্ত্রণা।".
.
আজমল সাহেবের মন হুট করে আনন্দে নেচে উঠলো। তিনি মহান বিজ্ঞানীর মতো বলে উঠলেন,"ইউরেকা! ইউরেকা!"
সবাই সাগ্রহে জানতে চাইলেন,'কি স্যার?"
আজমল সাহেব বললেন,"এখন থেকে ফ্রি ফেসবুক বন্ধ।"
.
উপসচিব নাসিম বললেন,"কিন্তু স্যার, আমাদের দেশে অনেকেই ফেসবুকের ফ্রি সেবাটি ইউজ করে। বিশ্বের ৬৮ টি দেশেও এই সেবাটি প্রচলিত। এর মাধ্যমে তারা নিউজ ও পড়ে। তাছাড়া আমাদের স্লোগান "ইন্টারনেট ফর অল"- এর সাথে এর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
.
আজমল সাহেব বললেন," শুনুন, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কি আপনাদের আর কোনো কথা বলার থাকতে পারে?"
সবাই একযোগে ডানে বামে মাথা নাড়ালো।
.
আজমল সাহেব খুশিমনে ঘোষণা করলেন,"আজ থেকে ফ্রি ফেসবুক বন্ধ।"
.
.


No comments