Header Ads

Header ADS

আফসোস

 




বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে আজ আমার প্রথম রাত। বইয়ের ভাষায় বাসর রাত। লাল শাড়ি পড়ে ঘোমটা দিয়ে বসে আছি। আসার সময় আম্মু এক বস্তা উপদেশ দিয়ে দিয়েছেন। ভালোমতো চলবি। বেশি কথা বলবি না। নমনীয় ভাষায় কথা বলবি।বেয়াদবি চলবে না। আরো কত্ত কি। 

একা একা বসে আছি। সকাল এগারোটায় যেই লোকটার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে তার আসার কথা। আসছে না কেন তা ই বুঝছি না। 

ডানে তাকিয়ে দেখলাম বালিশের নিচে নীলচে কিছু একটা দেখা যাচ্ছে।  হাত বাড়িয়ে দেখলাম একটা ম্যাগাজিন,-'রিয়েল সাইন্স এন্ড  ফিকশন'।

 নাহিয়ান দরজা খুলে প্রবেশ করলেন। 

আমি আম্মুর উপদেশমতো ভদ্রভাবে বসে আছি। 

তিনি খাটে বসলেন।কি জন্য জানি না হঠাৎ ই খুব ভয় হলো। কিসের ভয় কে জানে? 

.

তিনি বললেন,"আনিকা,তুমি খুব সুন্দর। " 

:থ্যাঙ্কিউ। 

:তুমি কি জানো,সৌন্দর্য কি? 

: সৌন্দর্য কি? 

:সৌন্দর্য হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।  এক এক জনের দৃষ্টিভঙ্গি এক এক রকম।তাই এক এক জনের কাছে সৌন্দর্য ও এক এক রকম। এই যেমন ধরো, তুমি কালো বিড়াল মোটেই পছন্দ করো না। এটা তোমার দৃষ্টভঙ্গি অন্যদিকে কেউ একজন হয়তো আছে যার কাছে শ্রেষ্ঠ মনে হয় কালো রঙের বিড়াল। এটা তার দৃষ্টিভঙ্গি।  

আমি এবার তার দিকে তাকালাম। মনে হলো আজকেই তাকে প্রথমবারের মতো নতুন করে দেখছি।বেশ লম্বা দেহ। ফর্সা বরণ, খাড়া নাক, নাকের ডগায় মোটা ফ্রেমের চশমা, চাপ দাঁড়ি। দেখলেই মনে হয় খুব জ্ঞানি একজন মানুষ। তার কাছে সব উত্তর পাওয়া যাবে। 

জিজ্ঞাসা করলাম,"আপনি কি সব জানেন?" 

তিনি উত্তর করলেন, "সব তো জানা কারো পক্ষেই সম্ভব না। তবে জানার চেষ্টা করি। যা জানি তা জানানোর চেষ্টা করি। আমার ভালোলাগে জানতে।জানাতে।

.

মানুষটার কথা বলার ভঙ্গি দারুণ লাগলো। এমনিতেই ছোটবেলা থেকেই আমি খুব কৌতুহলী।  এতোটাই কৌতুহলী যে, প্রতিটা প্রশ্নের উত্তরেই কেন জিজ্ঞাসা করতাম।একবার এমন হলো,

:আম্মু মানুষ কালো সাদা হয় কেন? 

:ম্যালালিনের জন্য।

:ম্যালালিন কেন হয়? 

:জানি না। 

:কেন জানো না? 

:তুই চুপ করবি? 

:কেন চুপ করবো? 

এর পরের ঘটনা আরো ভয়াবহ।  ১০০ বার কান ধরে উঠবস করিয়েছিলেন আম্মু। আর ডাইরিতে সই নিয়েছিলেন, 'আর যদি কখনো কেন বলি, তাহলে ২০০ কান ধরে উঠবস আর ৫০ বেতের বাড়ি খাবো। 

এর পর ও প্রশ্ন করেছিলাম কেন!! 

.

সে যাক। এবার ভালো একটা মানুষ পাওয়া গেছে। ইচ্ছামত কেন জিজ্ঞাসা করা যাবে। ইয়েস!!! 

মনের মধ্যে হাজার ওয়াটের বাল্ব জ্বলে উঠলো। 

" মেরা দিন আয়াহে,আয়াহে।"

আমি খুলে বসলাম আমার প্রশ্নের ঝুলি।

আচ্ছা, সব গ্রহ এন্টিক্লক ওয়াইজ ঘুরলেও বুধ কেন ক্লক ওয়াইজ ঘুরে? 

বারমুডা ট্রায়েঙেলে কেন জাহাজ উধাও হয়? আলোর গতি মাপা হলো কি করে?

 কেন মানুষের ধারণা হলো আলোর চেয়ে বেশি গতি অন্য কিছুতে নেই?

 বাতাস থেকে কিভাবে অন্যান্য উপাদানগুলো আলাদা করা হয়?

 মানুষ কেন তার ব্রেনের ১০০% ব্যবহার করতে পারে না?

 তিমি কেন শেষ বয়সে আত্নহত্যা করে?

 মেঘের ওজন ১.১ মিলিয়ন পাউন্ড হওয়া সত্ত্বেও মেঘ কেন ভাসে? 

আমি রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলাম তার উত্তর শুনে,প্রতিটা প্রশ্নের কতো সহজ স্পষ্ট  সুন্দর আর দারুণ ব্যখ্যা করতে করেন তিনি। 

.

দুই দিন পর আমার মা-বাবা এলেন আমার শ্বশুরবাড়িতে। তারা তাদের মেয়ে আর মেয়ে জামাইকে দাওয়াত করলেন এবং নিয়ে যাবেন। 

.

বাসায় যেতেই ছোটবোন শিরোপা যেন আনন্দে আত্নহারা হয়ে উঠলো। তার চোখেমুখে হাসি আর উত্তেজনা। 

সে আমাকে একা রুমে নিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। এত্ত নিরাপত্তা কেন কিছুই বুঝলাম না। শিরোপা জিজ্ঞাসা করলো,

:আপু, দুলাভাইকে তোর কেমন লেগেছে রে? 

:দারুণ!  

:তাই বুঝি। 

শিরোপার মুখে দুষ্টু হাসি। আপু দাঁড়া আমি কফি করে আনছি। তোর সাথে অনেক কথা আছে। 

:আচ্ছা।

শিরোপা কফি করে আনলো। 

:আচ্ছা আপু এবার বল, বাসর রাতে কি কি হলো!? 

:নাহিয়ান দারুণ একটা ছেলে বুঝলি। 

:আহা বল না। কি কি বললো!! হি হি। 

:সারা রাত আমরা গল্প করেছি। স্ট্রিং তত্ত্ব কি জানিস? স্ট্রিং তত্ত্ব হলো এমন একটা তত্ত্ব যে তত্ত্ব মহাবিশ্বকে ১০ টি ডায়মেনশন বা মাত্রায় কল্পনা করা হয়। 

ফার্স্ট ডায়মেনশনে,

মনে করা হয় একটা বিন্দু।ওই বিন্দুটাই আমাদের পুরো জগত। 

সেকেন্ড ডায়মেনশনে,

 আমরা কল্পনা করি কোনো বস্তুর দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ। 

থার্ড ডায়মেনশনে

 মূলত আমরা নিজেরাই বসবাস করি। এখানে দৈর্ঘ প্রস্থের সাথে আছে উচ্চতা।  

ফোর্থ ডায়মেনশনে,

 আমরা দৈর্ঘ্য প্রস্থ আর উচ্চতার সাথে যা পাই তা হচ্ছে সময়। এই ডায়মেনশন থেকেই মূলত আমরা টাইম ট্রাভেলের ব্যপারটা বুঝতে শুরু করবো। এখানে আমরা এক সময় থেকে অন্য সময় দেখতে পাবো। চাইলেই বৃদ্ধ অবস্থা দেখতে পাবো, চাইলেই শিশু অবস্থাও দেখতে পাবো। 

ফিফথ ডায়মেনশনে,

 ধারণা করা হয় চতুর্থ ডায়মেনশন সহ আরো যোগ হবে সমান্তরাল জগতের৷ এখানে অনেকগুলো জগত একইভাবে সমান্তরালে চলতে পারবে। 

সিক্সথ ডায়মেনশনে,

 এই সমান্তরাল জগতগুলোর মধ্যে মানুষ যোগাযোগ করতে পারবে। অর্থাৎ তুই নিজেই নিজের সাথে হ্যান্ডশেক করতে পারবি। 

সেভেনথ ডায়মেনশনে,

 তুই এক এক জগতে এক এক রকম থাকবি।যেমন ধর এই জগতে তুই ডাক্তার আছিস অন্য জগতে তুই লেখক হয়ে যাবি। 

আবার এইটথ ডায়মেনশনে

 তুই নিজের একই জগতের ছোট অবস্থা বৃদ্ধ অবস্থায় যেতে পারবি। মূলত এখান থেকেই টাইম ট্রাভেল শুরু। 

নাইন্থ ডায়মেনশনে, 

তোর এক এক জগত হবে এক এক রকম। এক এক জগতের গ্রাভিটি, সূত্র হবে আলাদা আলাদা। 

আর টেন্থ ডায়মেনশনে, 

কোনো বাধাধরা নাই।তুই সব সময়ে সব জগতে যেতে পারবি। যেভাবে ইচ্ছা বিচরণ করতে পারবি। মুসলিম মনিষীদের ধারণা, ও জগতেই স্রোষ্টার বসবাস। 

.

শিরোপা আমার দিকে হতাশার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছু বুঝেছে বলে মনে হলো না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, বুঝেছিস? 

ও হঠাৎ রাগ হয়ে গেলো, হুট করে হাত থেকে কফির মগটা নিয়ে গেলো। বললো,তোর আর কফি খেতে হবে না। 

মেয়েটা রাগ কেন করলো?কিছুই বুঝলাম না। 

সন্ধ্যায় মা আমার সাথে কথা বলতে এলেন। আমাকে একা একা নিয়ে কথা বলবেন নাকি। বারান্দায় গেলাম। 

:হ্যাঁ  মা বলো। 

মা জিজ্ঞাসা করলেন,"তোর জামাই পছন্দ হয়েছে?" 

:হ্যাঁ। খুব। 

:তোকে বোঝে? 

:দারুণ বোঝে!! 

:কিছু কি বলে? 

:হ্যাঁ  মা। কত্ত কথা বলে....জানো মা,পৃথিবীতে সবচেয়ে কৃপণ মানুষ কারা? 

:কারা? 

:যারা হজরত মুহাম্মদ (স) এর নাম শুনেও সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে না। তারা। 

মা পড়লেন,"সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। "

.

আমার সাথে নাহিয়ানের সম্পর্ক খুবই ভালো। সারাদিন এটা সেটা জানতেই থাকি। কতশত প্রশ্ন যে ঘুরপাক খায় মাথায়। এক একটা থিউরি ও দারুণ দারুণ সব চমক। আমরা অনেক অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলি। দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, ধর্ম, অর্থনীতি, মনস্তাত্ত্বিক আরো হাজার রকম বিষয়। 

.

গণতন্ত্র ভালো না সমাজতন্ত্র? আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি আমাদের জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ?ধর্ম কি পুরুষতান্ত্রিক? মানুষের পক্ষে অমর হওয়া কি আদৌ সম্ভব? পৃথিবীতে যুক্তির বাইরেও কি আদৌ কিছুর অস্তিত্ব আছে? কেন এক এক মানুষের এক এক বিষয়ে ভয়? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হওয়া কি প্রয়োজন ছিলো?যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়,তবে এর কারণ কি হতে পারে? 

.

কিছু কিছু বিষয় বিস্তারিত বুঝবার জন্য নাহিয়ান কিছু বই ও সাজেস্ট করে। আমি পড়ি। আরো প্রশ্ন জমা করি। সে উত্তর দেয়। যার উত্তর সে ও যুক্তিতে দাঁড় করাতে পারে না তা নিয়ে আরো স্টাডি করে। আমরা আলোচনা সমালোচনা করে বিষয়গুলোকে নিজের মতো করে সহজ করে তুলি। 

.

একদিন আমার শ্বাশুড়ি আমাকে ডাকলেন। তিনি খুবই আমলদার মানুষ৷ অধিকাংশ সময় ধর্ম কর্ম করেই সময় কাটান। হাতে তজবিহ গুণতে গুণতে তিনি বললেন,

:বউ মা।তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো। 

:জ্বী মা বলেন। 

:তোমার সাথে নাহিয়ানের বোঝাপড়া কেমন? 

:খুবই ভালো। নাহিয়ান তো চমৎকার একটা ছেলে। 

:আসলে বউমা। একটা কথা তোমাকে বলবো বলবো করে বলা হচ্ছে না।তুমি কি না কি মনে করো। 

:জ্বী মা বলেন। কিচ্ছু মনে করবো না। 

:তোমরা বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে কিছু ভেবেছ? আমি বুড়ো হচ্ছি, নাতি নাতনির....

:ও মা!!  এই কথা! এতে কিছু মনে করার কি আছে।এ তো আমি অনেক আগে থেকেই জানি। শুনুন মা, 

নারীর ডিম্বাণু পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হলে,এগুলো হয় গ্যামেট নামক বিশেষ প্রজনন কোষ, যেগুলো মিয়োসিস নামক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়। যেখানে সাধারণ কোষে ২৩ জোড়া অর্থাৎ ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে, সেখানে গ্যামেট কোষে শুধুমাত্র ২৩টি ক্রোমোজোম থাকে, এবং যখন দুটি গ্যামেট একত্রিত হয়ে জাইগোট বা ভ্রূণ গঠন করে তখন দুটি গ্যামেটের জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের মিশ্রণ ঘটে যাকে জেনেটিক রিকম্বিনেশন বলে, এবং নতুন ভ্রূণে মাতা পিতা উভয়ের কাছ থেকে আসা ২৩টি ক্রোমোজোম একত্রিত হয়ে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম গঠন করে। একটি নির্দিষ্টকালীন গর্ভধারণ পর্যায়ের পর (সাধারণত নয় মাস), প্রসবের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম হয়।

.

 মা চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দিয়ে তসবিহ পড়তে লাগলেন। মনে হলো আমার কথায় তার কোনো আগ্রহ ই নাই।

 আশ্চর্য মানুষগুলো এতো নিরস হয়ে পড়ছে কি করে!তাদের জানার প্রতি কোনো আগ্রহ ই নাই।অথচ জানান কত্ত বিশাল সমুদ্র পড়ে আছে, এক জীবনে এতো জানা সম্ভব নয় বলে আফসোস হয়!

#তুতুরি

No comments

Theme images by lobaaaato. Powered by Blogger.