Header Ads

Header ADS

ছাদ কিংবা প্রেমপত্র



 "তুই তোর বাচ্চা নিয়ে এক্ষণ বেড়িয়ে যাবি। যেখান থেকে আনছিস সেখানে ফেরত দিয়ে আসবি। ঢং আসছে। এদিক সেদিক হাঁটবে। গু করবে। পুরা ঘর গন্ধ ছড়াবে।" 

আমি বাচ্চা দুইটাকে হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

.

ছোট ছোট দুইটা মাসুম বাচ্চার জন্য আপুর মনে এটুকুন মায়া হয় না।মানুষ  কি করে হয় এতো হৃদয়হীনা!গোল গোল কালো চোখের দিকে তাকালেই তো হৃদয় মোমের মতো গলে যাওয়ার কথা। 

তাছাড়া আমি ছোট মানুষ,। এই বাচ্চাদের নিয়ে আমি যাবোই বা কোথায়।ফেরত তো নেবে না। এই ছোট বাচ্চাগুলোকে এত্ত বড় একটা ঘরে জায়গা দেওয়ার মতো হৃদয়টুকুও কেন আপুর নেই।

.

ঘটনা হচ্ছে, কলেজ থেকে ফেরার পথে দেখি এক লোক মুরগীর বাচ্চা নিয়ে বসে আছে। হলুদ হলুদ মুরগীর বাচ্চা দেখার পরই আর নিজেকে সামলাতে পারিনি। কিনে ফেললাম দুটো। 

বাসায় এসে আপুকে দেখাতেই আপু এতোটা রেগে গেলো। আমি অতোটা বুঝিনি আপু এভাবে রিয়েক্ট করবে। মনটাই খারাপ হয়ে গেছে৷ 

.

আম্মুও আপুকে কিছুই বললেন না। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বকা শুনলাম। রান্নাঘরে গিয়ে আম্মুকে বললাম,"আম্মু একটু বুঝাও না আপুকে। কেমন করে আমার সাথে। কই যাবো এই বাচ্চাগুলো নিয়ে! কে রাখবে বাচ্চা!" 

আম্মু যেন কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর বললেন,"একটা খাচা কিনে নিয়ে আয়। এর পর এগুলা ছাদে রাখ। তাহলেই তো হলো।" 

আম্মুর থেকে তিনশ টাকা নিলাম। একটা খাচা আর কিছু খাবার ও কিনতে হবে বাচ্চাদের জন্য। 

.

খাচা নিয়ে ছাদে গেলাম। পুরো ছাদ ঘুরে একটা কোন আবিষ্কার করলাম যেখানে ছায়া আছে। সহজে বৃষ্টির পানি ছিটিয়ে আসবে না খাচায়। একটু উপরে খাচা ঝুলিয়ে দিতে হবে যেন ইঁদুর বাচ্চাদের নাগাল না পায়। 

.

রিদু ভাইয়া কখন আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। ওরা আমাদের এক তলা উপরে D-2 তে থাকে। গোল কালো রঙের ফ্রেমের চশমা। বড় বড় চুল। হালকা ট্রিম করা দাঁড়ি। ওকে আমার দেখতে এত্ত ভালো লাগে। তার ওপর ভাইয়া দারুণ পিয়ানো বাজায়। গীটারেও এক্সপার্ট।  ড্রামস ও নাকি কিনেছে সপ্তাহ খানিক আগে। মাঝে মাঝে ফ্রেন্ডরা মিলে ছাদে যখন আড্ডা দেয়। উফ এতো দারুণ গায়!

ওর বোন রিয়ানার জন্মদিনে "হান্ড্রেড মাইলস" গানটা এত্ত দারুণ করে গেয়েছিলো। আমি সারা জীবন মনে রাখবো। 

.

তো রিদু ভাইয়া ডাকলেন,"কি বুড়ি কি করো?" 

ওনাকে দেখে যেন আমার মন খারাপের বাঁধ ভেঙে গেলো। আমি ঢুকরে কেঁদে উঠলাম।  আপু আমার বাচ্চাগুলোর সাথে কি কি আচরণ করেছে। সব বললাম। 

রিদু ভাইয়া আমাকে স্বান্তনা দিলেন। 

তারপর বললেন, "তুমি থাকো আমি একটু আসছি।"

রিদু ভাইয়া নিচে নেমে গেলেন। 

.

আমি ভাবছি,এক দিন এই মুরগী ডিম পাড়বে। আরো কত্তগুলা বাচ্চা হবে। বাচ্চা গুলা আরো ডিম পাড়বে। আরো আরো বাচ্চা হবে। একদিন এই ছাদ ভরে উঠবে আমার মুরগীর খাচা দিয়ে।

হৃদয়ে মাটি ও মানুষের- সাইখ সিরাজ চ্যানেল আই থেকে প্রতিবেদন করবে। সেদিন আমি বলবো, কতো বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে আমি গড়ে তুলেছি এই ফার্ম। মানুষ জানবে এক হৃদয়হীনার গল্প ও। 

.

রিদু ভাইয়া ফিরে এলেন অল্প সময়ের মধ্যেই। হাতে দুইটা ডেইরি মিল্কের প্যাকেট। 

:এই নাও।  আর মন খারাপ কইরো না। তোমার আপুর কথায়। 

আমি তো দারুণ খুশি। এত্ত দারুণ একটা মানুষের উপহার।আহা!

 চকলেটগুলা নিলাম।

খাচা ঝুলানো শেষ। এবার বাটিতে খাবার আর পানি দিলেই কাজ শেষ।।

রিদু ভাইয়া নিজের হাত কচলাতে কচলাতে অপরাধীর মতো বললেন,

:ইয়ে, আনিকা। একটা কাজ করে দিতে পারবা? 

:কি কাজ? 

:তোমার আপুকে এই চিঠিটা দিতে পারবা? 

রিদু ভাইয়া একটা চিঠি এগিয়ে দিলো। সাথে আরো দুইটা চকলেট৷ কি করবো কিছুই বুঝছি না। পাঁচ সেকেন্ড ভাবলাম। দুইটা চকলেট হাতছাড়া করার কোনো মানে হয় না। 

তাছাড়া এত্ত প্রিয় একটা মানুষের মনের বিষয়। 

চিঠিটা নিলাম। 

.

প্রেমপত্র না পড়েই কোনো মেয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে এ ইতিহাস নাই। এ কথা স্বয়ং নিতুই ভট্টাচার্য বলে গেছেন। তার এ দৈব সত্য ভাঙি সে সাহস কোথায় আমার! 

.

বাসায় এসেই রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে চারটা চকলেট ড্রয়ারে রাখলাম। 

এই চিঠি যে কোনো মূল্যেই আপুর হাত পর্যন্ত পৌছানো যাবে না। প্রেম নামক বিষাক্ত বস্ত থেকে আপুকে রক্ষা করা ছোটবোন হিসেবে আমার পবিত্র দায়িত্ব।  

চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম। 

পত্রের প্রথম কথাই ভুল। 

"প্রিয় ঈষিকা"একজন হৃদয়হীনা মেয়েকে প্রিয় বলা মারাত্নক ভুল৷ 

পুরোটা পত্র পড়লাম। সাহিত্য যেন ঢেলে দেওয়া হয়েছে পত্রে। চিঠির উত্তর দিতে বলা হয়েছে। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট ও নাকি আপুকে পাঠিয়েছে।  আপু এখনো এক্সেপ্ট করেনি। তাই এ পত্র। 

মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেলো। 'কি হবে,যদি আমি চিঠি লিখি? হ্যান্ড রাইটিং তো ভাইয়া চেনে না। তবে এমনভাবে লিখতে হবে যেন এর উত্তরে আরেকটা পত্র আসে। 

লিখে ফেললাম একটা চিঠি। কত্ত রকম উপদেশ দিয়ে। ফিউচার আরো কত্ত হাবিজাবি। 

কলেজ থেকে ফিরে ছাদে গেলাম। দেখি রিদু ভাইয়া আগে থেকেই অপেক্ষা করছেন। 

আমি গিয়ে চিঠিটা এগিয়ে দিলাম।ভাইয়া চিঠি নিয়ে চলে গেলেন। থ্যাঙ্কিউ  ও বললো।

.

পরদিন ই ভাইয়া আরেকটা চিঠি দিলেন। আপুকে দেওয়ার জন্য। সাথে দুইটা কিটক্যাট। চিঠিটা নিলাম। 

এভাবে প্রতিবার চিঠি নিয়ে প্রতিত্তোর আমি দিই। খুশিমনে চকলেট নিই। কিছু দিনেই আমার টেবিলের ড্রয়ার ভরে গেলো স্নেকার্স,পার্ক, ডেইরি মিল্ক, কিটক্যাট আর দারুণ দারুণ সব চকলেটে।

.

একদিন ভাইয়া আমাকে চকলেট সমেত একটা চিঠি দিচ্ছেন এমন সময়ই আপু ছাদে এলো। আপুকে দেখে আমি রিদু ভাইয়া দুই জনই তব্দা খেয়ে গেছি। 

রিদু ভাইয়ার তোতলানো শুরু করলেন, "ঈ.....ঈ......ঈষি!"

আমি দাঁড়িয়ে আছি নাকি কই আছি জানি না। মনে হচ্ছে পায়ের নিচে মাটি উধাও হয়ে যাচ্ছে। আপু চোখ রাঙিয়ে বললেন,"আনিকা নিচে যাও।" 

আমি টু শব্দটি না করে বাসায় চলে এলাম। 

রুমে বসে আছি। প্রায় ১৫ মিনিট পর আপু রুমে এসে জিজ্ঞাসা করলো, "চিঠি গুলা কই?" 

আমি ড্রয়ার খুললাম। আপু চিঠিগুলা নিয়ে নিলো৷ চকলেট গুলা আমার নিলো না একটাও। আপুটা একদম হৃদয়হীনা সম্ভবত না। একটু উদার আছে। 

আপু কড়া কন্ঠে বললো," কালকে থেকে ছাদে যেতে হবে না তোর।" 

আমি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললাম,

:আমার বাচ্চাগুলা! কে দেখবে? 

:বারান্দায় আইনা রাখবি। ঘরময় না হাঁটলেই তো আর ঘর নষ্ট হবে না। 

আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম।যার অর্থ হতে পারে "হ্যাঁ"।  আবার হতে পারে "না!"। 

অবশ্য আমার উত্তর শোনার অপেক্ষা আপু করলো না।

জানি না কেন, খুব খারাপ লাগতে শুরু করলো। মনে হচ্ছে কেউ যেন আমার থেকে পুরো আত্নাটা খুলে নিয়ে গেলো। 

শুধু খোলা ড্রয়ারে চকলেট গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। 

.

পরদিন আপু দুইটা খরগোশ কিনে আনলো। খরগোশের শরীর থেকে নাকি খুব গন্ধ হয়। এর খাচাটা ও ছাদে রাখবে। 

.

.

#তুতুরি

No comments

Theme images by lobaaaato. Powered by Blogger.